ফকির উয়ায়ছী-Fokir:
পবিত্র কোরআন অনুযায়ী ওলীল আমর শব্দটির অনুরূপ শব্দ হচ্ছে ইমাম, ফার্সী পীর, উর্দু ওস্তাদ, ইংরেজি লিডার /মাস্টার/টিচার, বাংলা নেতা/ হুকুম দাতা/ হুকুমের অধিকারী। এমনকি ইমাম শব্দটি আরবি, আমাম শব্দ থেকে এর উৎপত্তি; যার আভিধানিক অর্থ হলো, সম্মুখে, সামনে, অগ্রে ইত্যাদি। আমার জ্ঞান অনুযায়ী আলোচনা করলাম সামান্য যা শিক্ষা পেয়েছি আমার নেতা, ওস্তাদ, পীর যাই বলেন।
এই ওলীল আমরা যে বা যারাই হবে তারা আমাদের সামনে অর্থাৎ দুই চোখের সামনেই হতে হবে। তাই আমি বুঝতে পারি। অন্তত যখন আমরা তাদের নেতা বলে মেনে নিব। এমনকি রাছুল সা. এর হাদিস অনুযায়ী মৃত্যুর পর সে নেতাকেই আমাদের সাথে হাশরের ময়দানে আল্লাহ উঠাবেন।
“হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রাসূল সা. এর কাছে এসে জিজ্ঞাসা করল, ইয়া রাসূলুল্লাহ! কিয়ামত কখন হবে? নবী সা. নামাযে দাঁড়িয়ে গেলেন। নামায শেষে তিঁনি জিজ্ঞাসা করেন, কিয়ামত সংঘঠিত হওয়ার ব্যাপারে প্রশ্নকারী লোকটি কোথায়? সে বলল, ইয়া রাসূল সা.! এই যে, আমি। তিঁনি জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কিয়ামতের জন্য কি প্রস্তুতি নিয়েছ? সে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি অবশ্য তেমন লম্বা নামাযও পড়িনি, রোযাও রাখিনি, তবে আমি নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালবাসি। রাসূল সা. বললেন, যে ব্যক্তি যাকে ভালোবাসে, সে রোজ কিয়ামতে তার সাথেই থাকবে। আর তুমিও যাকে ভালোবাস তার সাথেই থাকবে”। তিরমিজী-২৩২৭
উক্ত এই হাদিসটিতে রাসূল সা. কিন্তু বলেন নাই তুমি আমার সাথে থাকবে, বরং বলেছেন তুমি যাকে পছন্দ কর তার সাথেই থাকবে। খুব সহজেই বুঝা যায় উম্মতে মুহাম্মদি সবার জন্যই একই নিয়ম। যারা রাসূল সা.কে সামনে পেয়েছিলেন এবং নেতা হিসাবে মেনেছিলেন এবং তাদের মৃত্যু পর্যন্ত রাসূল সা.কেই নেতা হিসাবে মেনেই মারা গেছেন। তারা তো রাসূল সা. এর সাথ পাবেনই। তারা বড়ই ভাগ্যবান। যারা রাসূল সা.কে পাওয়ার পরও মৃত্যু পর্যন্ত তিঁনার আদেশ নিষেধের খেলাফ কাজ করে মুত্যু বরণ করেছেন তারা কতই না দুর:ভাগা। এমনকি জাহান্নামী বলতেও দিধা করার কোন কারণ নাই। এই দুর:ভাগাদের কথা বুখারী শরীফের হাউজে কাউসার অধ্যায়ে হাদিস বিদ্যমান দেখে চিন্তা করার অনুরোধ রইল।
এই নেতার ব্যপারে আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেছেন সূরা বনি ইস্রাইলের ৭১ নং আয়াতে ১৭:৭১# “স্মরণ কর, যেদিন আমি প্রত্যেককে তার নেতাসহ আহবান করব, অতঃপর যাদেরকে তাদের ডান হাতে আমলনামা দেয়া হবে, তারা নিজেদের আমলনামা পাঠ করবে এবং তাদের প্রতি সামান্য পরিমাণও জুলুম হবে না।”
এই আয়াতটাও ভাল করে চিন্তা করলে উপরে উল্লেখিত হাদিসের সাথে মিলই পাওয়া যায়। আল্লাহ নেতা ছাড়া যেহেতু কাউকেই ডাকবেন না সেহেতু নেতা নির্ধারন করতেই হবে। না হয় যে আল্লাহ ডাকবেনই না। আর আল্লাহ যদি না ডাকেন তাদের জন্য তো জাহান্নাম অবধারিত। কারণ আল্লাহর জায়গা তো দুইটাই দেখি এক হলো জান্নাত ২য় হলো জাহান্নাম।
আল্লাহর কোরআন রাসূল সা. এর সহিহ হাদিস অনুযায়ী যার যার পছন্দ মত নেতা জীবনদশায় নির্ধারিত করতেই হবে। রাসূল সা. জীবিত থাকা শেষ বৃহস্পতিবারে ওসিয়ত লিখার সময় হযরত ওমর বলেছিলেন, তোমাদের নিকট আল্লাহর কুরআন বর্তমান আছে। উহাই আমাদের জন্য যথেষ্ট।’ -মুসলিম শরীফ হাদিস নং- ৪০৯০। কতই না ভাল হতো যদি এই কথার উপরই সমস্ত ইসলাম কায়েম থাকতো। মুসলমানদের জন্য একটাই মান্যবর সেটা হচ্ছে আল্লাহর কোরআন। তাহলে এত দল এত মতভেদ হওয়ার সুযোগ ছিল না।
মুসলমানদের মধ্যে মতভেদকারী দল সবচেয়ে বেশী। নেতা কাদেরকে মানতে হবে এবং কোন সময় পর্যন্তমানা যাবে এই ব্যপারে কোরআনে বলা আছে। নিম্নে আয়াটি পেশ করছি।
সূরা নিসা- ৪:৫৯#“ হে ঈমানদারগণ! আল্লাহর নির্দেশ মান্য কর, নির্দেশ মান্য কর রসূলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা বিচারক তাদের। তারপর যদি তোমরা কোন বিষয়ে বিবাদে প্রবৃত্ত হয়ে পড়, তাহলে তা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি প্রত্যর্পণ কর-যদি তোমরা আল্লাহ ও কেয়ামত দিবসের উপর বিশ্বাসী হয়ে থাক। আর এটাই কল্যাণকর এবং পরিণতির দিক দিয়ে উত্তম।”
আমার লেখা কথাগুলি চিন্তা করে যদি আমার ভুল থাকে অবশ্যই জানাবেন আমি কৃতজ্ঞতা ভরে আপনাদের কাছে জানতে চেষ্টা করবো। সুন্নিদের মধ্যে একদল বলেন রাসূল সা. আমাদের নেতা। আমি আপনাদের সাথে একমত পৌষন করছি। সেটা হচ্ছে হাশরের ময়দানে রাসূল সা. আল্লাহর সমস্ত সৃষ্ট উম্মতের জন্য সাফায়্যাতকারী নেতা। এই জামানায় যিনি আমায় আল্লাহর কোরআন এবং রাছুল সা. সঠিক জ্ঞান দান করবেন তাকেই আমি নেতা মানবো কোরআন অনুযায়ী। সূরা নিসার-৫৯ আয়াতটি আলোচনা করলে এবং আপনারা চিন্তা করলে আপনাদের মত জ্ঞানী মানুষরাও বুঝতে পারবেন।
উক্ত আয়াতটিতে পরিষ্কার বলা হয়েছে প্রথমে আল্লাহকে মান। ২য় বলা হয়েছে রাসূল সা.কে মান। এবং তোমাদের মধ্যকার হুকুমের অধিকারীকে মান। তিন আলাদা সত্ত্বাকে মানতে বলা হয়েছে। কিন্তু ৩য় সত্ত্বার সাথে যদি মতভেদ হয় তবে ১ম+২য় সত্ত্বার দিকে ফিরে যেতে বলা হয়েছে। অর্থাৎ আমার নেতা যদি আল্লাহ এবং রাসূল সা. এর কোন কথার সাথে মতভেদ করে শিক্ষাদেন সেটা মানা যাবে না। আর যারা রাসূল সা. কে এই দুনিয়াতে নেতা মনে করছেন তবে উক্ত আয়াতে যে মতভেদের কথা আছে এবং ফিরে যেতে বলেছেন রাসূল সা. এর দিকে। তখন কোন রাসূল এর দিকে ফিরবেন? রাসূল সা. হচ্ছেন সমস্ত বিশ্ব মানবের এমনকি সমস্ত নেতাদেরও নেতা। কাজেই চিন্তা করার অনুরোধ রইল।
একটি কথা উল্লেখ করার প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও উল্লেখ করছি পবিত্র কোরআনের প্রতিটি আয়াতই কিয়ামত পর্যন্ত বলবদ থাকবে কেউ যদি মনে করে এই আয়াতটা আমাদের জন্য বা ৫০০ বছর পর ঐ দলের জন্য প্রযোজ্য নয় সেটা আল্লাহর সাথে মত বিরোধই করা হবে।
মুসলমানদের মধ্যে সুন্নির পর শিয়ারা একটা বড় অংশ। শিয়াদের মধ্যে একটা জিনিষ দেখা যায় সূরা নিসার-৫৯ আয়াতকে তারা বলে এই আয়াত ১২ ইমাম পর্যন্তই বহাল। যেহেতু বার ইমামের শেষ ইমাম, ইমাম মাহদী তারাই হচ্ছেন প্রকৃত ওলীল আমর। এখানে একটা কথা বলতেই হয়। যে বার ইমামকে প্রতি ওয়াক্তে সালাম না দিলে নামাযই হয় না দরূদে ইব্রাহিমে দেখতে পাই। তাদেরকে তো অবশ্যই মাসুম হিসাবেই গ্রহন করতে হবে। আর যারা মাসুম তাদের সাথে আল্লাহ রাসূল সা. এর মতভেদ হবে যদি মনে করি সেটা তো ঈমান না থাকারই সামিল। কারণ উক্ত আয়াতটিতে মতভেদের কথা আছে। নবীর বংশের ১২ ইমামের কথা নবী বলে গেছেন। তাদের সাথে আল্লাহ রাছুল সা. সাথে মতভেদ হতে পারে না। আর যদি ১২ ইমামকেই নেতা হিসাবেই মানলে চলে তবে ১২ জনের সর্বৎকৃষ্টজন হযরত আলী রা.কে মানলেই তো হয়। যেহেতু তারা সকলেই আমাদের মাঝে বিদ্যমান নেই। এটা আমার ব্যক্তিগত মতামত।
অনেক শিয়া অনুসারীদের সাথে আলোচনা করেছি তারা বলেন এই আয়াত বুঝতে হলে কোরআনের সূরা মায়েদার ৫৫ নং আয়াত দেখতে হবে। আমি সেটা নিয়েও নিম্নে আলোচনা করছি পরিষ্কার করার জন্য।
৫:৫৫# “তোমাদের বন্ধু তো আল্লাহ তাঁর রসূল এবং মুমিনবৃন্দ-যারা নামায কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং বিনম্র।”
কোরআনের এই আয়াতটি সাথে কে দ্বিমত করতে পারে। এতবড় গোমড়া নাদান কে হতে পারেন। আমি অধম এই আয়াতের সাথে একমত পৌষন করি। শিয়া মাহজাবের অনুসারীরা বলেন শুধু এই আয়াতের অধিকারীরাই হচ্ছেন ওলীল আমর হওয়ার যোগ্য। এই আয়াতে তো মু’মিদের কথা বলা আছে। যদি শুধু ঐ ১২ জন ইমামই মুমিনবৃন্দদের মধ্যে পরেন তবে আমাদের ইবাদতের কি মূল্য। যদি আমরা মুমিনবৃন্দে সামিল নাই হতে পারি? নামায কায়েম যাকাত প্রদান তো আমাদের জন্যও ফরয। উল্লেখ্য মুমিন আরবী শব্দের বাংলা হচ্ছে ঈমানদার। যদি ইমানদার নাই হতে পারি ‘মুসলমানই’ বা হবো কি করে? মুসলমান না হলে নামায যাকাত পরা তো বেকার হয়ে যাবে। আল্লাহর হুকুম কোরআনে কিন্তু মু’মিনদের উপরই করেছেন। ৩:১০২# “হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে যেমন ভয় করা উচিৎ ঠিক তেমনিভাবে ভয় করতে থাক। এবং অবশ্যই মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।”
কাজেই চিন্তা করার আহবান করেই শেষ করছি। আমার মত সামান্য মানুষের কথা কেউ হয়তো কানেই নিবেন না। আল্লাহর কাছে আমার একান্ত চাওয়া মানুষের মধ্যে হিংসা ভুলে যার যার ধর্মে প্রতিষ্ঠিত থাকুন বিশেষ করে ইসলামে (শান্তিতে) প্রতিষ্ঠিত থাকুন। আমি আমার সৃষ্টি কর্তার প্রতি কৃজ্ঞতার জন্যই লিখছি।
ফকির উয়ায়ছী আত্মশুদ্ধিতেই আত্মতৃপ্তি, স্রষ্টার নৈকট্য লাভেই মুক্তি, ফকির উয়ায়ছী
