ফকির উয়ায়ছী:
সেজদা সম্পর্কে আমি আগেও লিখেছি একাধিকবার। এবার লিখাটা আমার এক শ্রদ্ধাভাজন এই বিষয়ে জানতে চাওয়ায় তাই সকলের জন্যই আবারোও লিখছি। আমি বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে একটি ঘটনা দিয়ে শুরু করছি। এই লেখা হয়তো আমার সে বাপজানও পড়বে। তবে তাকে ছোট করার উদ্দেশ্য নিয়ে লিখছি না। বৎসর দুয়েক আগে আমি গিয়েছিলাম ইন্ডিয়া। অনেক দুর থেকে একজন ভক্ত আমার সাথে দেখা করতে এসেছিলো কলকাতা শহরে। আমার সাথে যখন দেখা হলো তখন আমি রাস্তার মাঝে যেখান দিয়ে ট্রাম চলে। সে ছেলেটির সাথে যখন দেখা হলো তখন সে এসেই আমাকে সেজদা করলো। আমি বললাম বাবা তুমি আমাকে সেজদা করলে এটা তো আমি পছন্দ করি না। তুমি বা আমার সম্পর্কে কতটুকু জানো। ছেলেটি তখন বাংলায় এম ফিল করছে। অনেক শিক্ষিত সে আমাকে উত্তর দিলো। বাবা আমি আপনাকে যে শিক্ষার জন্য চিনেছি সে শিক্ষায় সেজদা দিয়েছি। আমি বললাম তারপরও বাবা। সেজদা দিয়ে যদি পরে আফসোস হয়। সে সেজদা বিফলে যাবে। ও আমাকে সম্মান দিয়েছে কিন্তু আমি অপারগতার জন্য তাকে সন্তুষ্ট করতে পারি নাই। এই জন্য আমি তার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী আজও। সে কিছু জানার আগ্রহ নিয়ে আমার কাছে এসেছিলো তা আমি বলতে পারি নাই। আমার তরিকত সেটা বলার অনুমতি দেয় না।
আমি আমার লেখার পূনরাবৃত্তি করছি এই বিষয়ে যদি উত্তম কোন পরামর্শ থাকে পাঠকগনের কাছে জানার আগ্রহ রাখছি। তবে অবশ্যই সে পরামর্শ যেন হয় কোরআন হাদিস সম্মত।
শুরুতেই শরিয়তের সেজদা নিয়ে একটু বলতে চাই যেটা আমরা ধর্মীয় ভাবে ইসলাম পালনের উদ্দেশ্যে ওয়াক্তিয়া নামায আদায় করার জন্য পালন করি। সে সেজদা অধিকাংশ মানুষই দেই আল্লাকে উদ্দেশ্য করে। কিন্তু সেজদা করার সঠিক নিয়ম অনেকেই পালন করি না। এই কথা বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে সঠিকভাবে নিয়ম পালন করে সেজদা দিলে কপালের মধ্যে ঠোয়া (কালো দাগ) পরার প্রশ্নই আসে না। কারণ ওয়াক্তিয়া নামাজের সেজদা দেওয়ার সময় শরীরের আটটি অঙ্গ মাটির সাথে স্পর্শ (ঠেকিয়ে) করেই সেজদা দিতে হয়। যেমন দুই পায়ের বৃদ্ধা আঙ্গুল, দুই হাটু, দুই হাতের তালু, নাক এবং কপাল। নাক আর কপাল এক সাথে ঠেকিয়ে যারা সেজদা দেয় নামাজ আদায় করে তাদের শুধু কপালে ঠোয়া (কালো দাগ) পরতে পারে না। আমার কথায় বিশ্বাস না হলে। সেজদা দেওয়ার সময় লক্ষ করবেন। আমার মুরশিদ কিবলা জানের বয়স ৮৯ পার হয়েছে আল্লার অশেষ রহমতে। তিঁনি ওয়াক্তিয়া নামায ক্বাজা করেছেন আমি দেখি নাই। তবে তিঁনার কপালটি দেখে কেউ বুঝতে পারবেন না। অথচ আমার মুরশিদ চেয়ারে বা বসে নামায আদায় করেও সন্তুষ্ট নন। ঘুষখোরা অবৈধ রোজগারী নব্য নামাযীদের অতি সহজেই কপালে কালো দাগ পড়ে যায়। কারণ তারা সেজদা দিয়ে কপাল ঘষতে থাকে।
মারেফতের বিভ্রান্ত অনুসারীরা তাজিমি (সম্মানের) সেজদার কথা বলেন। কিন্তু তারা একই ঢঙ্গে শরিয়তের নামাযের মতন করেই পিরের পায়ে মাথা ঠেকিয়ে সেজদা করেন। এরা বুঝে না তাজিমি সেজদার জন্য মাথা মাটি বা পায়ের উপর লাগানোর প্রয়োজন নাই। আপনারা যারা আমার লেখা পরবেন তাদের প্রায় সকলেরই জানা মার্শাল আর্ট (জুডো/ কারাটে) খেলার সময় শুরুতেই ওস্তাদ এবং প্রতিদন্দিকে সম্মান প্রদর্শনের জন্য বো করে অর্থাৎ মাথা নিচু করে। এমনকি চীন, জাপান, কোরিয়ার সালাম প্রদর্শনের এটাই রীতি। তারা তো তাজিম (সম্মান) করার সময় মাথা কোথাও স্পর্শ করে না? তাতেও তো তাদের সম্মানে কোন ঘাটতি হয় না!
বাংলাদেশের কিছু সেজদা প্রত্যাশী পির সাহেবরা মুরিদের সেজদা নিয়েই বড় পির সাজতে চান। এমনিই একজন পির তার কিতাবে উল্লেখ করেছেন তা হুবহু উদৃত্তি করছি নিম্নে ২য় বন্ধনীতে:
{যারা সবসময় তৌহিদে বাস করছে তারা কোন মতেই শেরেক করতে পারে না। যেহেতু পশু প্রাণীরা তৌহিদে বাস করছে সেহেতু তাদের পক্ষে শেরেক করার কথাটি অসম্ভব এবং অবান্তর। আল্লাহকে ছাড়া অন্যকে যদি সেজদা দেওয়া শেরেক বলে ধরে নেই, তাহলে মহানবীকে পশু প্রাণীরা কেন সেজদা করলো?}
এই লেখক প্রশ্ন করেছেন নবীকে দেজদা করলো কেন? পশুরা যে সেজদাই করেছে এই বিজ্ঞ লোকটি বা নিশ্চিত হলেন কেমন করে? এটা আমার প্রশ্ন? আল্লার শ্রেষ্ঠ জীব আশরাফুল মাখলুকাত হওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও যদি লেখক পশুকেই সবচেয়ে বেশী তাওহিদবাদী মনে করেন। তাকে কি বলার কিছুই থাকেন না। চিন্তা করে দেখা দরকার বাঘ যদি এতই তাওহিদবাদী থাকতে পারতো হরিণের ঘাড়ে কামড় বসাতে হতো না। অযথা মন গড়া মুখে তকমা লাগানো কথা বলে মানুষকে বিপথগামীই করা হবে। তিনার বই যদি সবচেয়ে বেশী তাওহিদবাদীরা পড়তো প্রশ্ন যেহেতু লেখক করেছেন উত্তর মিলতো আশা করি। কপাল খারাপ লেখক প্রশ্ন করেছেন পশুদের কিন্তু তিনার মনোনীত তাওহিদবাদীরা (পশুরা) কিতাব পড়ে না। যেহেতু তাওহিদ শব্দের অর্থ একত্ববাদ (আল্লার একত্ববাদ) তবে তো হিংস্র পশু নিরিহ পশুকে ধরে খাওয়ার প্রশ্নই উঠতো না। আল্লার অপেক্ষায় থাকতো যতই ক্ষুধার্থ হোউক।
অন্যদিকে এই দলেরই কিছু অনুসারীরা বলে সেজদা না দিয়েই তো ইবলিশ হয়েছে আজাজীল! তাদের মাথায় ধরে না আজাজীল ছিল ফেরেস্তা। ফেরেস্তাদের প্রতি আল্লার হুকুম ছিল আদমকে সেজদা করার। এটা কোরআনের একাধিক আয়াতেই পাওয়া যায়।
৭:১১#“আমি ফেরেশতাদেরকে বলছি-আদমকে সেজদা কর তখন সবাই সেজদা করেছে, কিন্তু ইবলীস সে সেজদাকারীদের অন্তর্ভূক্ত ছিল না।”
২০:১১৬#“যখন আমি ফেরেশতাদেরকে বললামঃ তোমরা আদমকে সেজদা কর, তখন ইবলীস ব্যতীত সবাই সেজদা করল।”
১৫:৩০-৩১# “ফেরেশতারা সবাই মিলে সেজদা করল। কিন্তু ইবলীস-সে সেজদাকারীদের অন্তর্ভূক্ত হতে স্বীকৃত হল না।”
ফেরেস্তারা আদমকে সৃষ্টির শুরু থেকেই সেজদা করেছে কিয়ামতের আগ পর্যন্ত করেতেই থাকবেন। কিন্তু আদম তারই মতন আর এক আদমকে সেজদা করবে এটা তো কোরআনে উল্লেখ নাই। এই ব্যপারেও কোরআনের একটি আয়াত দেখিয়ে ভ্রান্ত পিরগন বলে সেজদা করা জায়েজ সূরা ইউসুফ
১২:১০০# “তিনি পিতা-মাতাকে সিংহাসনের উপর বসালেন এবং তারা সবাই তাঁর সামনে সেজদাবনত হল। তিনি বললেনঃ পিতা এ হচ্ছে আমার ইতিপূর্বেকার স্বপ্নের বর্ণনা আমার পালনকর্তা একে সত্যে পরিণত করেছেন এবং তিনি আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। আমাকে জেল থেকে বের করেছেন এবং আপনাদেরকে গ্রাম থেকে নিয়ে এসেছেন, শয়তান আমার ও আমার ভাইদের মধ্যে কলহ সৃষ্টি করে দেয়ার পর। আমার পালনকর্তা যা চান, কৌশলে সম্পন্ন করেন। নিশ্চয় তিনি বিজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।”
ইউসুফ যে নবী ছিলেন তার বাবা সেটা ইউসুফ শিশু বয়স থেকেই জানতে পেরেছিলেন তার ছোট সন্তান নবী হবেন। ইউসুফকে সেজদা করেন নাই। ইউসুফ নবী হবার পর সেজদা করেছেন সকলে। আল্লা পবিত্র কোরআনের আয়াতে তাঁর প্রিয় হাবীব রাছুল সা. এর প্রতি নির্দেশ করেছেন
৭৬:২৬#“ রাত্রির কিছু অংশে তাঁর (আল্লার) উদ্দেশে সিজদা করুন এবং রাত্রির দীর্ঘ সময় তাঁর পবিত্রতা বর্ণনা করুন।”
আল্লা যে আদমকে স্বহস্তে বানিয়ে ছিলো তাকে সিজদা করার হুকুম ছিল ফেরেস্তাদের।
৩৮:৭৫# “হে ইবলীস, আমি স্বহস্তে যাকে সৃষ্টি করেছি।”
৭:১১#“আমি ফেরেশতাদেরকে বলছি-আদমকে সেজদা কর তখন সবাই সেজদা করেছে, কিন্তু ইবলীস সে সেজদাকারীদের অন্তর্ভূক্ত ছিল না।”
২০:১১৬#“যখন আমি ফেরেশতাদেরকে বললামঃ তোমরা আদমকে সেজদা কর, তখন ইবলীস ব্যতীত সবাই সেজদা করল।”
আল্লা আদম আ.কে নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন। আর আমার মতন অধম পাপীকে তো বানিয়েছেন পচা পানি থেকে। তা কোরআনের অনেক আয়াতে উল্লেখ আছে। আল্লার স্বহস্তে বানানো আদম আর আমাদের মতন মানুষকে যারা একই রকম মনে করবেন তারা তো অর্বাচীন বুদ্ধিপ্রতিবন্ধীও বটে। এরা আমাদেরই মধ্যে থেকে কাউকে কাউকে আল্লা হিসাবেই নির্বাচন করছেন। নিন্মের ৩২:৭-৮ আয়াত দুটি চিন্তা করে দেখার আহবান জানাচ্ছি।
৩২:৭-৮# “যিনি তাঁর প্রত্যেকটি সৃষ্টিকে সুন্দর করেছেন এবং কাদামাটি থেকে মানব (আদম) সৃষ্টির সূচনা করেছেন। অতঃপর তিনি তার বংশধর সৃষ্টি করেন তুচ্ছ পানির নির্যাস থেকে।”
৮৬:৬-৭# “সে সৃজিত হয়েছে সবেগে স্খলিত পানি থেকে।এটা নির্গত হয় মেরুদন্ড ও বক্ষপাজরের মধ্য থেকে।”
উপরোক্ত আয়াত পঠনে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ব্যতীত সকলে বুঝতে পারবেন আদম আ.কে আল্লা মাটি থেকে বানিয়েছেন। সেজন্যই আল্লার হুকুম ছিলো ফেরেস্তাদের উপর আদমকে সেজদা করার। সেজদা না করার জন্য মকরম ফেরেস্তা ইবলিশ হয়েছিলো। মারেফতের কিছু বিভ্রান্ত পির তাদের অনুসারীদের শিক্ষা দিচ্ছে। সেজদার বিরোধী কথা বললেই বলে; শুধু ইবলিশই সেজদা বিরোধী ছিলো। এই সমস্ত উন্মাদ প্রাণী আল্লা এবং রাছুল বিরোধী মুশরিক।
সবেগে স্খলিত পচা পানি থেকে যারা সৃষ্ট তাদের প্রতি আল্লার হুকুম আল্লাকে সেজদা করো।
আদমের জন্য আল্লার হুকুম তো ৫৩:৬২#“অতএব আল্লাহকে সেজদা কর এবং তাঁর এবাদত কর।”
সেজদা সম্পর্কে রাছুল সা. এর একটি হাদিস নিন্মে উল্লেখ করছি। চিন্তা করে দেখার অনুরোধ এই হাদিস সেজদার পক্ষে নাকি বিপক্ষে যায়? সে বিবেচনার ভার আপনাদের উপরই রইল।
হাদিস: “হযরত মুয়াজ রাঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন, যদি আমি যদি কোন ব্যক্তিকে অন্য কাউকে সেজদা করার আদেশ দিতাম, তাহলে আমি স্ত্রীদের আদেশ দিতাম তাদের স্বামীকে সেজদা দিতেন”।
আল্লা যদি আদমকে তারই মতন এক আদমকে সিজদা করার অনুমতিই দিতেন তবে রাছুল সা. এই হাদিসটি বলতেন বলে আমি বিশ্বাস করতে পারি না। কাজেই কেউ যদি কাউকে সেজদা (সর্বচ্চ) সম্মান দিতে চায় তবে তাকে অবশ্যই জানতে হবে সেজদা দেওয়ার আগে সে ব্যক্তিটি পাপের উর্দ্ধে উঠতে পেরেছেন কি না। যদি তা জেনে সেজদা দেওয়া হয় তবে সেটা বিফলে যাবে না।
পবিত্র কোরানে আমি স্পষ্ট দেখতে পাবেন আল্লা প্রথমে আদমকে সেজদা করতে বলেছেন ফেরেস্তাদের। এরপর আদমের প্রতি হুকুম করেছেন আল্লাকে সেজদা করতে। কোরানে আছে মুসাকে যাদুকরেরা ভয়ে সেজদা দিয়েছে। সেখানে সেজদাকারীগন কাফের ছিলো। সেজদা গ্রহনকারী ছিলো নবী। আপনারা নিশ্চয়ই কাফেরদের মতন সেজদা করছেন না! আর যাকে সেজদা করছেন বিভ্রান্তপির মুসার মতন কেরামতও দেখান নাই। কাজেই সেজদা দেওয়ার আগে চিন্তা করবেন।
আল্লা রাছুল সা. বিরোধী পিরের চেহারা ধ্যান শেরেকির মত বেদাতী কর্ম, ভন্ড, কান্ডজ্ঞানহীন, নির্বোধ, ইবলিশ প্রজাতির মারেফতের অনুসারীরা বলে পিরকে আল্লা মনে করে সেজদা দিতে হবে। এই জন্যই আল্লা বলেছেন কোরআন জ্ঞাণীদের জন্য। মনে রাখা জরুরী যে সকল লোক পিরকে আল্লা মনে করে সেজদা দিবে হাশরের সময় রাছুল সা. তাদের সাক্ষ্যদানের এখতিয়ার রাখতে পারেন না। কাজেই চিন্তা করবেন যদি রাছুল সা. এর সাফায়্যাৎ প্রয়োজন মনে করেন।
ফকির উয়ায়ছী আত্মশুদ্ধিতেই আত্মতৃপ্তি, স্রষ্টার নৈকট্য লাভেই মুক্তি, ফকির উয়ায়ছী
